দীর্ঘদিন ধরে জুরাইন-শ্যামপুর এলাকায় গ্যাস সংকট চলছে। এই সমস্যা আজকালকার নয়। বছরের পর বছর এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন এই এলাকার নাগরিকরা। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর মানুষ একই দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো গ্যাস একেবারেই থাকে না, কখনো থাকলেও চাপ এতটাই কম থাকে যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করাও সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকটের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করেছে, মানববন্ধন করেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে, সমাধানের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু এত দীর্ঘ প্রতিবাদের পরও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সুফল। গ্যাস সংকট যেন জুরাইন-শ্যামপুরের মানুষের জীবনেরই একটি স্থায়ী অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মানুষের এই মৌলিক নাগরিক সমস্যাটিও এখন নোংরা রাজনীতির শিকার। বিগত সরকারের আমল থেকেই ছিল এই গ্যাস সংকট। তখন মানুষ মুখ খুললেই বলা হতো, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য এই অভিযোগ করা হচ্ছে। মানুষের ঘরে গ্যাস নেই, রান্না করতে পারছে না, বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, এসব বাস্তবতাকেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এখন সরকার পরিবর্তনের পর মানুষ আবার যখন একই সমস্যার কথা বলছে, তখন নতুন করে বলা হচ্ছে, ‘১৭ বছর কই ছিলেন?’ আমরা জানতে চাই, এই প্রশ্নের সঙ্গে আজকের গ্যাস সংকটের সম্পর্কটা কী? আগের সরকার কী করেছে, কে কত বছর ক্ষমতায় ছিল, কার সময়ে কী ব্যর্থতা হয়েছে, সেটি রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব। কিন্তু সেই রাজনৈতিক হিসাবের বোঝা জুরাইন-শ্যামপুরের সাধারণ মানুষ কেন বইবে? আমরা তো এখানে আপনাদের রাজনীতির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে আসিনি। আমরা কোনো দলের পক্ষে কিংবা কোনো দলের বিপক্ষে নিজেদের জীবনযাপন করছি না। আমরা নাগরিক হিসেবে নিজেদের ন্যায্য অধিকারটুকু চাই। আমাদের দাবি খুব সাধারণ। যে সেবার জন্য আমাদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই সেবাটুকু আমরা চাই। এর মধ্যে রাজনীতি খোঁজার কী আছে, সেটিই বরং আমাদের বোধগম্য নয়। মানুষের চুলায় গ্যাস নেই, অথচ সেই মানুষ কেন আগের সরকার ও বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বিতর্কের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার চাইবে? বছরের পর বছর এই এলাকার মানুষ লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন। একটি আধুনিক নগরীর অংশ হয়েও জুরাইন-শ্যামপুরের অসংখ্য পরিবারকে গ্যাসের পরিবর্তে লাকড়ি জোগাড় করে রান্না করতে হচ্ছে। এই লাকড়ির চুলায় রান্না করতে করতে তাদের জীবন, বাড়িঘর, রান্নাঘর সবকিছু লাকড়ির ছাইয়ের মতো কালো হয়ে গেছে। রান্নাঘরের দেয়ালে ধোঁয়ার আস্তরণ জমছে, ঘরের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে বড় কথা, যে নাগরিকরা নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করেন, তাদেরই বছরের পর বছর বিকল্প জ্বালানি কিনে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। একটি পরিবার একই সঙ্গে গ্যাসের বিল দেবে এবং গ্যাসের বিকল্প জ্বালানিও কিনবে, এই দ্বৈত বোঝা কেন নাগরিককে বহন করতে হবে? এগুলো দেখার কি কেউই নেই? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি জানে না যে জুরাইন-শ্যামপুরের অসংখ্য পরিবার বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না? তারা কি জানে না যে মানুষকে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে? তারা কি জানে না যে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয়ের ওপর এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে? যদি সবই জানা থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যবস্থা কোথায়? আর যদি জানা না থাকে, তাহলে আরও বড় প্রশ্ন হচ্ছে, নাগরিকদের সমস্যার খোঁজ রাখার দায়িত্ব যাদের, তারা আসলে কী করছেন? অথচ গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে যতই সংকট থাকুক, বিল আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো সংকট নেই। মাসে মাসে বিল না দিলে লাইন কাটার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, মামলা করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়া মানুষকে লাখ লাখ টাকা বকেয়া ও জরিমানার বোঝা গুনতে হচ্ছে। অর্থাৎ নাগরিক সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ব্যর্থতা চলতে পারে, কিন্তু নাগরিকের কাছ থেকে বিল আদায়ের ক্ষেত্রে এক দিনেরও ছাড় নেই। সেবা না থাকলেও বিল চাই, বিল না দিলে জরিমানা চাই, জরিমানা না দিলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি চাই। এই ব্যবস্থার যুক্তিটা কী? আরেহ ভাই, যে সেবা আমি পাচ্ছি না, সেই সেবার জন্য টাকা আমি কেন দেব? এই প্রশ্নের উত্তর কি এতই কঠিন? একজন নাগরিক যদি বছরের পর বছর পর্যাপ্ত গ্যাস না পান, তাহলে তার কাছ থেকে সেই সেবার পূর্ণ বিল কেন নেওয়া হবে? সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে যদি কোনো ঘাটতি না থাকে, তাহলে জুরাইন-শ্যামপুরের মানুষকে গ্যাস দেওয়া হোক। আর যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে সেই ঘাটতির দায়ও স্বীকার করতে হবে। নাগরিকের ঘাড়ে পুরো দায় চাপিয়ে দিয়ে সেবাদাতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে না। সরকারকে এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট জবাব দিতেই হবে। গ্যাস না পাওয়া সত্ত্বেও কেন নাগরিকদের কাছ থেকে নিয়মিত বিল আদায় করা হচ্ছে, কেন তাদের ওপর বকেয়া ও জরিমানা চাপানো হচ্ছে, কেন বছরের পর বছর সংকট চলার পরও কার্যকর সমাধান হচ্ছে না, এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতে হবে। শুধু ‘১৭ বছর কই ছিলেন’ বলে এই প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অতীতের ব্যর্থতা বর্তমানের অজুহাত হতে পারে না। আগের সরকার ব্যর্থ হয়ে থাকলে তার জবাবদিহি হবে। কিন্তু সেই ব্যর্থতার ধারাবাহিকতা যদি বর্তমানেও চলতে থাকে, তাহলে বর্তমান দায়িত্বশীলদেরও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। জুরাইন-শ্যামপুরের মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না। তারা কোনো সরকারের পতন চাইছে না। তারা কোনো দলের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধাও চাইছে না। তারা শুধু চায়, তাদের ঘরে গ্যাস থাকুক এবং সেই গ্যাসের জন্য তারা নিয়ম অনুযায়ী বিল দিক। এর চেয়ে স্বাভাবিক, এর চেয়ে ন্যায্য দাবি আর কী হতে পারে? রাষ্ট্র যদি নাগরিকের কাছ থেকে তার পাওনা আদায়ের বিষয়ে এতটা কঠোর হতে পারে, তাহলে নাগরিকের প্রাপ্য সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাকে একইভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। নাগরিকের দায়িত্ব শুধু বিল দেওয়া নয়, রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব শুধু বিল চাওয়া নয়। রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে অর্থ নেয় সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে। সেই সেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সেবা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে তার ব্যাখ্যা দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমরা আবারও স্পষ্ট করে বলতে চাই, জুরাইন-শ্যামপুরের মানুষ আপনাদের রাজনীতির উপাদান নয়। তাদের দুর্ভোগ কোনো দলের বক্তব্যের হাতিয়ার নয়। ‘১৭ বছর কই ছিলেন’ কিংবা ‘সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এসব বলা হচ্ছে’ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মানুষের রান্না হবে না, তাদের দুর্ভোগও কমবে না। গ্যাসের সংকটকে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টির মধ্যে আটকে না রেখে সমস্যার সমাধান করতে হবে। যে মানুষ বছরের পর বছর গ্যাস পায়নি, তার কাছে বিল চাওয়ার আগে সরকারকে অন্তত একবার নিজের কাছে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা তাকে কী সেবা দিয়েছি? আর যদি সেই প্রশ্নের উত্তর সন্তোষজনক না হয়, তাহলে নাগরিকের কাছ থেকে বিল ও জরিমানা আদায়ের নৈতিক ভিত্তি নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। জুরাইন-শ্যামপুরের মানুষ কারও রাজনৈতিক ঢাল নয়। তারা কারও ব্যর্থতা আড়াল করার উপাদান নয়। তারা নাগরিক। তাদের ঘরে গ্যাস থাকা তাদের অধিকার। আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে, যে সেবার মূল্য তারা পাননি তার বিল কেন দিতে হবে, এই প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব সরকারকে দিতেই হবে।