অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংস্থাগুলো

নিজস্ব প্রতিবেদক
    Update Time : Tuesday, June 30, 2026
  • 36 Time View

অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে দেশের সরকারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) দীর্ঘদিনের লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসিবে বর্তমানে অতি উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মূলত বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম মূল্যে বিক্রি করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ঘাটতির মুখে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিপিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। আর অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট লোকসান ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। যা আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। তাছাড়া বিদ্যুৎ খাতে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল), ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন বাংলাদেশ পিএলসি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো) ও নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ­াই লিমিটেড (নেসকো)। অর্থ বিভাগ এবং জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বিপিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নিয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত সংস্থাটি ভর্তুকি নিয়েছে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা  বিপিডিবির খরচের বড় অংশ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে চলে যাচ্ছে। ফলে ধাপে ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও সংস্থাটিকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের করা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা (ইউনিট) বিদ্যুৎ পাইকারি পর্যায়ে বিক্রিতে সংস্থাটিকে প্রায় ৪০ শতাংশ ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে।

সূত্র জানায়, উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের দেশের সরকারি আরো ৬টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) রয়েছে। সংস্থাটি বিপিডিবির কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে ঢাকার একটি অংশ ও নারায়ণগঞ্জের গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে সংস্থাটি জানিয়েছে, ডিপিডিসির সামগ্রিক পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে কমিয়ে আনার পরও বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের কারণে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট লোকসানের পরিমাণ ৬৪৩ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩০৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩৭ কোটি টাকা লোকসান করেছে। বিইআরসিতে জমা দেয়া প্রতিবেদনে ডিপিডিসি জানিয়েছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো না হলে সংস্থাটির রাজস্ব আয়, পরিচালন ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়জনিত ক্ষতিতে ক্রমান্বয়ে রুগ্ন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। যদিও এরই মধ্যে সব সংস্থার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি। তাছাড়া উচ্চ আর্থিক ঝুঁকির তালিকায় ঢাকার আরেক অংশের বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত কোম্পানি ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) রয়েছে। গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নীতকরণ, স্ক্যাডা সিস্টেম, প্রি-পেইড মিটার স্থাপন, ইআরপিসহ বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সংস্থাটি বড় অর্থ ব্যয় করেছে। অথচ সংস্থাটির একমাত্র আয় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি। কিন্তু গত কয়েক বছর যে হারে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, সেই হারে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়েনি। ফলে কমে গেছে সংস্থাটির আয় ।

সূত্র আরো জানায়, দেশের বিদ্যুৎ খাতের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ৭টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাও রয়েছে উচ্চ আর্থিক ঝুঁকিতে। জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এঙ্প্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেঙ্) অতি উচ্চ ঝুঁকিতে আছে। কোম্পানিটি দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কাজে নিয়োজিত। কিন্তু কোম্পানিটি যে হারে গ্যাস উত্তোলন করে তা দিয়ে রাজস্ব পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে। সরকারের ৫০ কূপ খনন কার্যক্রমে বাপেঙ্ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খনন করছে। ওসব কূপ খনন করতে গিয়ে কোম্পানিটি রিগ ক্রয়, কূপ খননে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল (জিডিএফ) এবং বিভিন্ন বিদেশী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাছাড়া দেশে জ্বালানি খাতের বিপণন কোম্পানি হিসেবে যমুনা অয়েল পিএলসি, গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল), জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেড আর্থিকভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, বিদ্যুৎ খাতের বিশেষত বিপিডিবির আর্থিক সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিনের। সংস্থাটিকে এ জায়গা থেকে বের করে আনতে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর ট্যারিফ রিভিউ করা হয়েছে। যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানির ট্যারিফ রিভিউয়ে বিপিডিবির একটা কমিটি কাজ করছে। আইপিপিগুলো নিয়েও কাজ চলছে। ফলে এ অবস্থা যে একদিনে হয়েছে বিষয়টি এমন নয়।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved@railwayupdate24