পশ্চিমাঞ্চল রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে ২,০২৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ সরকারের

Reporter Name
    Update Time : Wednesday, May 13, 2026
  • 70 Time View

নিরাপদ ও দ্রুত ট্রেন চলাচল নিশ্চিত, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবার মান উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক রেল সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে বড় ধরনের অবকাঠামো পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সর্বশেষ সভায় ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন (প্রথম ধাপ)’ শীর্ষক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। যার পুরো অর্থই সরকারি নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে ব্যয় করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ রেলওয়ে বাস্তবায়ন করবে।

পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্প ২০৩১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি মূলত তিনটি প্রধান লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। এগুলো হলো- নির্ধারিত গতিতে নিরাপদ ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবার মান উন্নয়ন এবং রেল অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো। ওই কর্মকর্তা জানান, পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল নেটওয়ার্কে ক্রমবর্ধমান পরিচালন চাপ এবং দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলকে রাজধানীর সঙ্গে যুক্ত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডর।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগের সদস্য (সচিব) এসএম শাকিল আখতার বলেন, পশ্চিমাঞ্চলের রেললাইন আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন ও রক্ষণাবেক্ষণে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। তিনি জানান, বাংলাদেশ রেলওয়েতে এখনো আধুনিক লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) ও কোচের সংকট রয়েছে। তাই বাড়তি চাহিদা মোকাবিলায় গত একনেক সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়কে নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও মালবাহী বগি সংগ্রহে নতুন প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে বর্তমানে ১,৯৩০.৮৮ রুট কিলোমিটার এবং ২,৫০৫.৫০ ট্র্যাক কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। এসব রেলপথে নিয়মিত যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। তবে এই নেটওয়ার্কের বড় অংশ ১৯৩০, ১৯৪৩, ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে স্থাপিত পুরোনো রেললাইন দিয়ে গড়ে ওঠায় অনেক অংশ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বেশ কিছু অংশে রেললাইনের ক্ষয়ের হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফলে রেললাইনে ফাটল, ওয়েল্ডিং জয়েন্টে ত্রুটি এবং লাইন ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এতে নিরাপদ ট্রেন চলাচলে ঝুঁকি বাড়ছে। পরিকল্পনা কমিশনের ওই কর্মকর্তা জানান, রেললাইনের স্লিপার ও ব্যালাস্টের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অনেক এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ স্লিপার ক্ষতিগ্রস্ত ও অকেজো হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা ও সঠিক গেজ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যালাস্টেরও ঘাটতিও দেখা দিয়েছে। এতে ট্র্যাকের ভারসাম্য ও গেজ সুরক্ষা দুর্বল হয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। সৈয়দপুর-জয়দেবপুর করিডোরসহ কয়েকটি রেলপথ ২০০০ সালের শুরুর দিকে পুরোনো সরঞ্জাম দিয়ে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। বর্তমানে সক্ষমতার চেয়ে বেশি ট্রেন চলাচলের কারণে এসব লাইনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এতে রেললাইন, স্লিপার ও ফিটিংসের কার্যকারিতা দ্রুত কমে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক এলাকায় ট্রেনের গতিসীমা কমিয়ে আনতে হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ভবানীপুর থেকে এমজিএমসিএল পর্যন্ত ২১.৪৯২ কিলোমিটার রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন করা হবে। এছাড়া ৫০০.২ কিলোমিটার রেললাইনে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আরও ৪৩.৯০ কিলোমিটার রেলপথের পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন করা হবে। এর মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ও মালবাহী পরিবহন সচল রাখতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রেলপথকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এর মধ্যে রয়েছে জয়দেবপুর-ইব্রাহিমাবাদ, সয়দাবাদ-ঈশ্বরদী বাইপাস, ঈশ্বরদী বাইপাস-মালঞ্চি, ভেড়ামারা-ঈশ্বরদী বাইপাস, মালঞ্চি-সাহাগোলা, সাহাগোলা-সান্তাহার, সান্তাহার-জয়পুরহাট, জয়পুরহাট-বিরামপুর, বিরামপুর-পার্বতীপুর, আব্দুলপুর-রাজশাহী কোর্ট এবং ভবানীপুর-মধ্যপাড়া রেলপথ। প্রকল্প এলাকা রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের একাধিক জেলায় বিস্তৃত। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী ও কুষ্টিয়া। দেশীয় পরিবহন উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকল্পটি আঞ্চলিক রেল সংযোগ জোরদারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল বেনাপোল, দর্শনা, রহনপুর, বিরল ও চিলাহাটির মতো প্রধান স্থলবন্দর দিয়ে মালবাহী পরিবহনের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। এসব বন্দরে নিয়মিত পাথর, বোল্ডারসহ ভারী মালামাল পরিবহন করা হয়।

কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে- বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেলভিত্তিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংহতি বৃদ্ধির উদ্যোগগুলোও শক্তিশালী হবে। প্রকল্পটি ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক (টিএআর), দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক), বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) ফোরাম, বিমস্টেক এবং বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) উদ্যোগের মতো আঞ্চলিক সংযোগ কাঠামোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ইতোমধ্যে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন করেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved@railwayupdate24