অস্বাভাবিক সম্প্রসারন বা সংকোচন নয়, চাই জনবান্ধব অপটিমাম বাজেট

লিপিকা আফরোজ
    Update Time : Wednesday, June 10, 2026
  • 164 Time View

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ ও শহুরে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। ২০২৬-২৭ বাজেটের প্রধান দিকগুলো হলো: বাজেটের আকার: ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি: ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১.১৬ লাখ কোটি টাকা এবং ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১.৩৫ লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট আগামীকাল জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন। এবছর বাজেটের প্রধান লক্ষ্য মূল্যস্ফীতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান রক্ষা। বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে অর্থনীতিকে বেগবান করতে ৩ হাজার কোটি টাকার তহবিল দিয়ে সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি’র পথে এগিয়ে নেওয়া। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এটি প্রথম বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়নের তুলনায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্পের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিলে ২২৫ কোটি টাকা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের প্রস্তাব থাকতে পারে। কিন্তু বাজেটের আকার যত বড়ো হবে, সরকারের কর আহরণের পরিমান ততো বাড়বে। এতে বেসরকারী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে, ফলে কর্ম সংস্থান বৃদ্ধির পরিবর্তে হ্রাস পাবে। প্রতিবছর যে বিশাল সংখ্যার শিক্ষিত তরুণ দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে তাঁদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্বাধীনতার পরে বা আগে কোনো সরকারই সফলতা দেখাতে পারেনি। বেকারত্ব এদেশে অন্যতম একটি বৃহত সমস্যা হিসেবে ছিলো, এখনো আছে, অদূর ভবিষ্যতে যে এই সমস্যার সমাধান হবে এমনটা ভাবারও অবকাশ নেই। তবে সব সরকারই চেষ্টা করেছে বেকারত্ব হ্রাস করার। বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতি গতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে ঠিক, কিন্তু এতে বেসরকারী খাতে নতুন কোনো কর্মসৃজন হবে কিনা তা নিশ্চিত করে বলাযায় না। বরং বিদ্যমান শ্রমবাজারের আকার এতে ছোটো হবার সম্ভাবনা তৈরি হবে। অন্যদিকে বাজেটের আকার ছোটো হলে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকান্ড শ্লথ হবার সম্ভাবনা থাকে। এই দ্বিমুখী প্রভাব বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, শ্রমবাজারের অবস্থা, দ্রব্যমূল্য, সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক পরিস্থিতি সবকিছুর মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে একটি অপটিমাম আকারের বাজেট সবার কাম্য। প্রস্তাবিত বাজেটের সঠিক বাস্তবায়ন এদেশের প্রেক্ষাপটে আরেকটি চ্যালেঞ্জ। বিগত বছরগুলিতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসুচী (এডিপি) বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। অর্থবছরের শুরুরদিকে এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুবই কম থাকে। জুন মাসে অর্থাৎ অর্থবছরের শেষে এসে হঠাত করে এডিপি বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুব দ্রুত গতিতে এগোয়। এতে আর্থিক অনিয়মসহ জনমনে নানা ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়। এই সন্দেহ দূর করতে প্রস্তাবিত বাজেটের রুপরেখা সঠিক সময়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও আসতে পারে। এছাড়া ২৫ লাখ নাগরিকের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ কর্মসূচি চালুর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বেশ কয়েকটি নতুন কর্মসূচি যুক্ত করার পাশাপাশি বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। সব কার্যক্রম দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি বিদেশে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরাইল ও আমেরিকার ইরানে হামলা, মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের মার্কিন সামরিক ঘাটিতে ইরানের হামলা ইত্যাদি নানাবিধ জটিলতায় এই লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই দূরুহ হবে বলে অনেকের ধারণা। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার কিভাবে অগ্রসর হবে, এর কতোটা বাস্তবায়ন সম্ভব তা নিয়এ বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে সাধারন মানুষের মাঝে। যুবসমাজকে মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে রাখতে ও সৃজনশীল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে। আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য বাজেটে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি অর্থ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করা হবে। বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে অনলাইনে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর রিটার্ন অনলাইনে দাখিল, সরাসরি ব্যাংক হিসাবে কর ফেরত এবং কর-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব আসতে পারে। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা ছাড়া উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আগামী বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এদিকে বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো চ্যালেঞ্জ থাকলেও চলমান সংস্কার কার্যক্রম অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আমাদের সবার প্রত্যাশা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved@railwayupdate24