বিভিন্ন পথে দেশে অবৈধভাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি টাকার স্বর্ণ ঢ়ুকছে

Reporter Name
    Update Time : Sunday, August 30, 2026
  • 30 Time View

অবৈধভাবে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি টাকার স্বর্ণ ঢ়ুকছে। তারপর আবার পাচার হয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশে। মূলত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালানিদের নিরাপদ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। আর সোনা চোরাচালন নেটওয়ার্কের শিকড়ও অত্যন্তগভীরে। তার সঙ্গে দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেশের বিমানবন্দরগুলোতে বিগত ২০২১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি সোনা উদ্ধার হয়েছে। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। ওই সময়ে সরকার দেশে বৈধভাবে আসা সোনা ও অলংকার থেকে সরকার রাজস্ব আদায় করেছে মোট ২৩৮ কোটি টাকা। বাজুস, এনবিআর এবং বিজিবি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনা চোরাচালান হচ্ছে তার যৎসামান্যই উদ্ধার হচ্ছে। আকাশপথে বিভিন্ন এয়ারলাইনসে করে দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই অবৈধভাবে সোনার চালান আসছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কৌশলে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। বরং আকাশপথে দেশে আসা সোনা প্রতিবেশী একটি দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আর ওই সোনা পাচার হচ্ছে ৮টি সীমান্ত জেলার অন্তত ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে। তবে মাঝে মধ্যে সোনা চোরাচালানের সময় গ্রেপ্তারের ঘটনা থাকলেও রাঘববোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিযানে কেবলমাত্র বাহকরা ধরা পড়ছে। মূলত সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর থেকে চোরাই পথে দেশে সোনা আসছে। সূত্র জানায়, আকাশপথে বাংলাদেশে সোনা চোরাচালান আসার প্রধান পথ হচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিগত ৫ বছরে ওই পথে প্রায় দুই হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। তবে তারপর ধারাবাহিকভাবে সোনার চালান কমলেও এখন বড় হয়েছে চালানগুলোর আকার। চলতি বছরেই ওরকম তিনটি বড় চালান ধরা পড়েছে। গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেলের ভেতর থেকে ১৫৩টি স্বর্ণের বার উদ্ধার করা হয়। যার ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম আর বাজার মূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। ২ জুলাই আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম (১৬০টি বার) স্বর্ণ জব্দ হয়, যার মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। আর ১৯ জুলাই ক্যাথে প্যাসিফিক কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে আসা রাম্বুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি কাঠের ক্রেট থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। মূল্য প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। তাছাড়া ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরে একটি গাড়ি থেকে ১.৮১২ কেজি স্বর্ণের বার ও শিট উদ্ধার করা হয়। যার বাজার মূল্য প্রায় ৩.৭৩ কোটি টাকা। বিগত ২০২১ থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা কাস্টমস প্রায় ২ হাজার কেজি সোনা জব্দ করেছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণ ও অলংকার থেকে মাত্র ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকার শুল্ক আদায় হয়েছে। এখনো দুবাই স্বর্ণের প্রধান উৎস। তাছাড়া স্বর্ণ আসে ওমান, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকং থেকেও। প্রবাসীদের ট্যাক্স ও কমিশন দিয়ে ব্যাগেজ রুলের ফাঁক গলে সোনার বার আনা হয়। তাছাড়া সোনা চোরাচালনে পায়ুপথ, জামার সুতা, ইলেকট্রিক ডিভাইসসহ নানা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশন, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মী অর্থের বিনিময়ে বড় চালান নিরাপদে বের করে দেয়। তবে অনেক সময় সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কোনো কোনো সোনার চালান ধরা পড়ে। সূত্র আরো জানায়, নানাভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আকাশপথে আসা স্বর্ণের প্রায় ৯০ শতাংশই প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যায় স্থলপথে। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহসহ ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো চোরাচালানের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর ভারতে সোনা পাচারের বড় কারণ হচ্ছে শুল্ক। বাংলাদেশে ১০ গ্রাম স্বর্ণের শুল্ক যেখানে মাত্র ১৫০ টাকা, ভারতে তা প্রায় ৪ হাজার টাকা। যশোর সীমান্ত এখন দুবাই-ঢাকা-ভারত রুটের নিরাপদ পথ। যশোরে ২০২৪ সালে ১৫১ কেজি, ২০২৫ সালে ৬৮.৫ কেজি এবং ২০২৬ সালের মে পর্যন- ২৪ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর ২০২১ থেকে ২০২৬ বিগত ৫ বছরে ঢাকার বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের অভিযোগে মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। তার মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি। তাছাড়া বিগত ২০২৫ সালে সীমান্ত এলাকা ও বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযানে বিজিবি ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ উদ্ধার করে। তবে জব্দ হওয়া স্বর্ণের পরিমাণ প্রকৃত চোরাচালানের ১০ শতাংশেরও কম বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এদিকে স্বর্ণখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাগেজ রুলের অপব্যবহার, উচ্চ শুল্ক ব্যবধান এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তার কারণে দেশে কমছে না সোনা চোরাচালান। দেশে স্বর্ণের বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন। কিন্তু চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ স্বর্ণ শুল্কায়নের মাধ্যমে দেশে ঢ়ুকছে। ২০২২ সালে শুল্কায়নের মাধ্যমে অন্তত ৫৪ টন স্বর্ণ দেশে ঢ়ুকেছে। যা চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। তার বাজারমূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু ওই সোনার বেশির ভাগই স্থলপথে অন্য দেশে পাচার হয়ে যায়। স্বর্ণ চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন জানান, সোনা চোরাচালান রোধে বাজুস সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। বাজুস চায় বাংলাদেশে অবৈধ পথে স্বর্ণ আসা কিংবা চালান হওয়া বন্ধ হোক। তাতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে এবং সরকারও রাজস্ব হারাবে না। বর্তমানে জুয়েলারি শিল্প একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণের দামের অত্যধিক ওঠানামার কারণে সাধারণ ক্রেতারা গয়না কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তার মধ্যে যদি অবৈধভাবে স্বর্ণ চোরাচালান ঘটতে থাকে, তাহলে সোনা খাতের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved@railwayupdate24