সারে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ

Reporter Name
    Update Time : Tuesday, September 15, 2026
  • 39 Time View

কৃষি খাতে সরকারি বরাদ্দের প্রায় ৮০ শতাংশই সারের ভর্তুকি। কিন্তু কৃষকের সুবিধার্থে সরকার সারের দাম বাড়ায়নি। মূলত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি এবং ডলারের দাম বাড়ার কারণে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সারের আমদানি খরচ। কিন্তু ডিলার পর্যায়ে সব ধরনের সার নির্ধারিত আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। তাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ।

বিগত ২০২৩ সালে সরকার সর্বশেষ কৃষক পর্যায়ে সারের দাম কেজিপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়েছিলো। তার আগে ২০২২ সালের ১ আগস্ট ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছিল কেজিতে ৬ টাকা। অথচ বিশ্ববাজারে ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর পর্যন্ত ৪ বছরে রাসায়নিক সারের আমদানি মূল্য বেড়েছে অর্ধেকেরও বেশি। কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সারের দাম ডিলার পর্যায়ে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন। বর্তমানে ইউরিয়া প্রতি কেজি ২৫ টাকা, টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) প্রতি কেজি ২৫ টাকা, ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট) প্রতি কেজি ১৯ টাকা এবং এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) প্রতি কেজি ১৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষি খাতে ইউরিয়া হচ্ছে সবচেয়ে ব্যবহৃত ও গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক সার।

বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের কেজিপ্রতি আমদানি মূল্য ৪৫ টাকা ছিলো। আর ডিলার পর্যায়ে বিক্রয়মূল্য ২৫ টাকা হওয়ায় সরকারকে কেজিপ্রতি ২০ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। কিন্তু পরের বছর ইউরিয়ার আমদানি মূল্য বেড়ে ৪৯ টাকায় দাঁড়ায়। তখন ডিলার পর্যায়ে ২৫ টাকা বিক্রয়মূল্য বজায় রাখতে সরকারের কেজিপ্রতি ভর্তুকি বেড়ে ২৪ টাকায় দাঁড়ায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি মূল্য ৬১ টাকা হওয়ায় ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রতি কেজিতে ৩৬ টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ইউরিয়ার আমদানি মূল্য ৬৫ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তখন কেজিপ্রতি ডিলার মূল্য ২৫ টাকা স্থির রাখতে সরকারের ভর্তুকি সর্বোচ্চ ৪০ টাকা গুনতে হবে। ফলে ৪ বছরের ব্যবধানে ইউরিয়া সারে দ্বিগুণ হচ্ছে সরকারের ভর্তুকি।

সূত্র জানায়, বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিএসপি সারের কেজিপ্রতি ৬২ টাকা আমদানি মূল্য ছিল। ডিলার পর্যায়ে তখন সরকার ৩৭ টাকা ভর্তুকি দিয়ে ২৫ টাকায় সরবরাহ করত। পরের অর্থবছরে ওই সারের আমদানি মূল্য বেড়ে হয় ৭৬ টাকা এবং ভর্তুকি দাঁড়ায় ৫১ টাকায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি মূল্য আরো বেড়ে ৮৪ টাকায় পৌঁছে এবং ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিএসপির আমদানি মূল্য ১০১ টাকায় পৌঁছাতে পারে। তাতে ডিলার পর্যায়ে আগের ২৫ টাকা দাম বজায় রাখতে সরকারকে গুনতে হবে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৭৬ টাকা ভর্তুকি। ফলে ৪ বছরে টিএসপি সারে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১০৫ শতাংশ বেড়ে ৩৭ টাকা থেকে ৭৬ টাকায় পৌঁছাবে। তাছাড়া বর্তমানে জমিতে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস উপাদানের জোগান দিতে কৃষকদের কাছে ডিএপি সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববাজারে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সার ডিএপি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিএপি সারের আমদানি মূল্য ছিল ৭৭ টাকা। সরকার প্রতি কেজিতে ৫৮ টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের সুবিধার্থে ডিলারদের কাছে মাত্র ১৯ টাকায় তা বিক্রি করে। পরের অর্থবছরে আমদানি মূল্য বেড়ে ৮৯ টাকা হলে কেজিপ্রতি ভর্তুকি বেড়ে ৭০ টাকায় দাঁড়ায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএপির আমদানি মূল্য ১০০ টাকা অতিক্রম করে ১০৮ টাকায় ঠেকে। তখন সরকার কেজিপ্রতি ৮৯ টাকা ভর্তুকি দেয়। আর সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ডিএপি সারের কেজিপ্রতি সম্ভাব্য আমদানি মূল্য দাঁড়াচ্ছে ১২৮ টাকা। তাতে সরকার দাম অপরিবর্তিত রাখলে ১০৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। তাছাড়া গাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত এমওপি (পটাশ) সারের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কেজিপ্রতি আমদানি মূল্য ছিল ৪৫ টাকা। আর সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ২৭ টাকা। পরের অর্থবছরে আমদানি মূল্য দুই টাকা কমলে ভর্তুকি ২৫ টাকায় নেমে এসেছিলো। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি মূল্য ৫১ টাকা হওয়ায় প্রতি কেজিতে ৩৩ টাকা ভর্তুকি দিতে হয়। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমদানি মূল্য দাঁড়াবে ৫৪ টাকা। ফলে সরকারকে দিতে হবে ৩৬ টাকা ভর্তুকি। সূত্র আরো জানায়, দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে সার খাতে সরকারের বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি প্রদান দেশের সার্বিক কৃষির জন্য স্বস্তিদায়ক। কিন্তু সারের ওপর এককভাবে সরকারের ওই বিশাল ভর্তুকির চাপ কমাতে হলে সুষম সার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তুলনামূলক দামি ও বেশি ভর্তুকিনির্ভর সারের অপচয় রোধ এবং স্থানীয়ভাবে সার কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখা জরুরি।

বর্তমানে দেশে বছরে সারের মোট চাহিদা প্রায় ৬৯ লাখ টন। তার মধ্যে চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। চাহিদার মধ্যে রয়েছে ২৭ লাখ টন ইউরিয়া, সাড়ে ৭ লাখ টন টিএসপি এবং ১৫ লাখ টন ডিএপি। তাছাড়া এমওপির চাহিদা সাড়ে ৯ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। আর দেশের ৭টি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৭ লাখ টনের বেশি। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওসব কারখানা মাত্র ১১ লাখ ছয় হাজার টন সার উৎপাদন করেছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved@railwayupdate24